ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিব ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

শুক্রবার   ২৪ জানুয়ারি ২০২০   মাঘ ১১ ১৪২৬   ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

নারী-পুরুষের নামাজের পার্থক্য

দৈনিক নেত্রকোনা

প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি ২০২০  

নারী-পুরুষের নামাজে পার্থক্য আছে কিনা? নারী ও পুরুষের নামাজের পার্থক্য সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। নারী-পুরুষের নামাজে পার্থক্য নেই, একথা ভুল। 

নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-  

নারী পুরুষের মাঝে প্রকৃতি ও সৃষ্টিগত দিক থেকে যেমন পার্থক্য রয়েছে ঠিক তেমনিভাবে শরীয়তের বিধিবিধানের ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের মাঝে রয়েছে পার্থক্য। এটি একটি প্রমাণিত বিষয়। নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এতেও কিছু বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে।  

নারী ইমামতি করতে পারে না। পুরুষ ইমামতি করতে পারে। নারী আজান ইকামাত দিতে পারে না। কিন্তু পুরুষ আজান ইকামাত দিতে পারে। নামাজে কোনো সমস্যা হলে পুরুষ সুবহানাল্লাহ বলে লোকমা দেয় আর নারী হাত তালি দেয়। দেখুন; সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২১৮। 

নারীর মাথা ঢেকে নামাজ পড়া ফরজ। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৬৪১, সুনানে তিরমিযি, হাদিস : ২৭৫, সহিহ)। কিন্তু পুরুষের ওপর মাথা ঢেকে নামাজ পড়া ফরজ নয়। নারীর ওপর জুমা ও ঈদের নামাজ নেই। কিন্তু পুরুষের জন্য আবশ্যক। তাহলে কীভাবে বলা যায় নারী পুরুষের নামাজে কোনো পার্থক্য নেই। এসব পার্থক্যের মতো নারী পুরুষের নামাজের মাঝে আরো কিছু পার্থক্য রয়েছে। হাত বাঁধা, রুকু, সেজদা ও বসার মাঝে রয়েছে পার্থক্য। এ পার্থক্যগুলোও হাদিস-সুন্নাহ, সাহাবিদের বাণী ও শিক্ষা দ্বারা প্রমাণিত এবং উম্মতের ওলামাগণের কাছে সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত। 

এ বিষয়ে উম্মতের ফকিহ ও ইমামদের মাঝে কোনো ইখতিলাফ ও দ্বিমত নেই। কোনো সাহাবি, তাবেয়ি এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেনি। চার মাজহাবের ইমারাও এ বিষয়ে একমত। তাই এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করার অর্থ হচ্ছে, পুরো উম্মাহর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
 
হাদিসে এসেছে হজরত যায়েদ ইবনে আবি হাবিব (রহ.) থেকে বর্ণিত যে, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজরত দুই নারীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদেরকে বললেন, যখন সেজদা করবে তখন শরীর জমিনের সঙ্গে মিলিয়ে দেবে। কেননা, নামাজে নারী পুরুষের মতো নয়। -কিতাবুল মারাসিল, ইমাম আবু দাউদ, হাদিস : ৮০, গাইরে মুকাল্লিদ ইমাম নবাব সিদ্দিক হাসান খান রহ. বলেন,

ﻫﺬﺍ اﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﻤﺮﺳﻞ ﻗﺎﺑﻞ ﻟﻼﺳﺘﺪﻻﻝ ﺑﻪ ﻋﻠﻰ أﺻﻮﻝ ﺟﻤﻴﻊ ﺍلأﺋﻤﺔ.

এই মুরসাল বর্ণনা সকল ইমামের মূলনীতি অনুযায়ী প্রমাণযোগ্য। আউনুল বারী ১/৫২০

গাইরে মুকাল্লিদ ইমাম আমিরে সনআনি (রহ.) ও নারী-পুরুষের নামাজের পার্থক্যের বিবরণ দিতে গিয়ে এই হাদিসকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। -দেখুন, সুবুলুস সালাম ১/৩৫১-৩৫২

ওয়ায়েল ইবনে হুজর রা. বলেন,

ﺟﺌﺖ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ الله ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻘﺎﻝ ... ﻳﺎ ﻭﺍﺋﻞ ﺑﻦ ﺣﺠﺮ ﺇﺫﺍ ﺻﻠﻴﺖ ﻓﺎﺟﻌﻞ ﻳﺪﻳﻚ ﺣﺬﺍﺀ ﺃﺫﻧﻴﻚ ﻭﺍﻟﻤﺮﺃﺓ ﺗﺠﻌﻞ ﻳﺪﻳﻬﺎ ﺣﺬﺍﺀ ﺛﺪييها.

আমি রাসূলের কাছে এলে তিনি বললেন হে ওয়ায়েল ইবনে হুজর, যখন তুমি নামাজ পড়বে তখন হাত উঠাবে কান বরাবর। আর নারী হাত উঠাবে বুক বরাবর। -আলমুজামুল কাবির ২২/১৯-২০, এই হাদিসের সনদ হাসান। 

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

ﺇﺫﺍ ﺟﻠﺴﺖ ﺍﻟﻤﺮﺃﺓ ﻓﻲ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻭﺿﻌﺖ ﻓﺨﺬﻫﺎ ﻋﻠﻰ ﻓﺨﺬﻫﺎ ﺍلأﺧﺮﻯ ﻭﺇﺫﺍ ﺳﺠﺪﺕ أﻟﺼﻘﺖ ﺑﻄﻨﻬﺎ ﻓﻲ ﻓﺨﺬيها كأﺳﺘﺮ ﻣﺎ ﻳﻜﻮﻥ ﻟﻬﺎ.          

নারী যখন নামাজে বসবে তখন যেন (ডান) উরু অপর উরুর ওপর রাখে। আর যখন সেজদা করবে তখন যেন পেট উরুর সঙ্গে মিলিয়ে রাখে। যা তার সতরের জন্য অধিক উপযোগী। -আস সুনানুল কুবরা, বাইহাকী ২/২২৩, এই হাদিসের সনদ হাসান। 

আলী (রা.) বলেন,

ﺇﺫﺍ ﺳﺠﺪﺕ ﺍﻟﻤﺮﺃﺓ ﻓﻠﺘﺤﺘﻔﺰ ﻭﻟﺘﺼﻖ ﻓﺨﺬﻳﻬﺎ ﺑﺒﻄﻨﻬﺎ

নারী যখন সেজদা করবে তখন যেন সে জড়সড় হয়ে সেজদা করে এবং উভয় উরু পেটের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। -মুসান্নাফ : আব্দুর রাযযাক ৩/১৩৮, এই হাদিসের সনদ মযবুত।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে নারীদের নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন,

ﺗﺠﺘﻤﻊ ﻭﺗﺤﺘﻔﺰ.

খুব জড়সড় হয়ে অঙ্গের সঙ্গে অঙ্গ মিলিয়ে নামাজ আদায় করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ১/৩০২, এই হাদিসের সনদ সহিহ। 

নারীদের নামাজের পার্থক্যের বিষয়টি যেসব তাবেয়ি ইমামগণ থেকে বর্ণিত-

আতা ইবনে রাবাহ (রহ.) থেকে।- দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ১/২৭০।
ইবনে জুরাইয (রহ.) থেকে। দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ১/২৭০। 
মুজাহিদ (রহ.) থেকে। - দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ১/৩০২ 
ইবনে শিহাব যুহরি (রহ.) থেকে। -দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ১/২৭০। 
হাসান বসরি ও কাতাদা (রহ.) থেকে। -দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ১/৩০৩
ইবরাহীম নাখায়ী (রহ.) থেকে।-দেখুন : মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ১/৩০২

উল্লিখিত হাদিস ও আছারসমূহের আলোকে পরবর্তী যুগের সব ফকিহ ও মুহাদ্দিস নারীদের নামাজের পার্থক্যের কথা বলেছেন। এবং এটিই সুন্নাহ। নারী পুরুষের নামাজে কোনো পার্থক্য নেই, এটি একটি ভুল, বিচ্ছিন্ন ও অগ্রহণযোগ্য বক্তব্য। সাহাবা তাবেয়িনসহ উম্মতের ইমামদের কেউই একথা বলেননি।  

হাদিসের ভুল প্রয়োগ: গায়রে মুকাল্লিদ বন্ধুরা বলেন, নারী পুরুষের নামাজে কোনো পার্থক্য নেই, তারা নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করেন।
 
عَنْ أَبِي سُلَيْمَانَ مَالِكِ بْنِ الْحُوَيْرِثِ قَالَ أَتَيْنَا النَّبِيَّ صَلَّى اللّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنَحْنُ شَبَبَةٌ مُتَقَارِبُونَ فَأَقَمْنَا عِنْدَه عِشْرِينَ لَيْلَةً فَظَنَّ أَنَّا اشْتَقْنَا أَهْلَنَا وَسَأَلَنَا عَمَّنْ تَرَكْنَا فِي أَهْلِنَا فَأَخْبَرْنَاهُ وَكَانَ رَفِيقًا رَحِيمًا فَقَالَ ارْجِعُوا إِلى أَهْلِيكُمْ فَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّيْ.

আবু সুলাইমান মালেক ইবনুল হুআইরিস (রা.) বলেন, আমরা প্রায় সমবয়স্ক কয়েকজন যুবক আল্লাহর রাসূলের কাছে আসলাম। তাঁর নিকট বিশ দিন অবস্থান করলাম। (এ দীর্ঘ অবস্থানের কারণে) তাঁর কাছে মনে হলো, আমরা আমাদের স্ত্রীদের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েছি। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা পরিবারে কাদেরকে রেখে এসেছি। তখন আমরা বিষয়টি তাকে অবহিত করলাম। আর তিনি ছিলেন স্নেহশীল ও দয়ালু। তিনি বললেন, তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে যাও। তাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেবে ও (দ্বীনী বিষয়ে) তাদেরকে আদেশ নিষেধ করবে। আর তোমরা নামাজ আদায় করবে সেভাবে, যেভাবে আমাকে নামাজ আদায় করতে দেখছো। সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০০৮ 

আসলে এটি তাদের দলিল হয় না। এটিকে তাদের দলিল মনে করা একটি বড় ভুল। কেননা এ হাদিসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন পুরুষকে সম্বোধন করে বলেছেন যে, তোমরা আমাকে যেভাবে নামাজ পড়তে দেখ সেভাবে নামাজ পড়। এ হাদিসে আল্লাহর রাসূল নারীদেরকে সম্বোধন করে একথা বলেননি। সুতরাং এ হাদিসে নারীদের নামাজের কোনো কথা নেই। যদি এ হাদিসে নারীদের সম্বোধন করা হতো তাহলে অবশ্যই সাহাবায়ে কেরাম (রা.) নারী পুরুষের নামাজে পার্থক্য নেই, একথা বলতেন। যেহেতু সম্বোধন করা হয়নি তাই তারা নারী পুরুষের নামাজের পার্থক্যের কথা বলেছেন। এবং তারা যে নারী পুরুষের নামাজের পার্থক্যের কথা বলেছেন, আবশ্যই তারা সেটি আল্লাহর রাসূল থেকেই গ্রহণ করেছেন। 

তাবেয়ি ইমামরাও বুঝেছেন যে, এ হাদিসে নারীদের নামাজের কথা বলা হয়নি। তাই তারা নারী-পুরুষের নামাজে পার্থক্য নেই, একথা বলেননি। বরং তারা নারীদের নামাজের পার্থক্যের কথা বলেছেন। যেমনটি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। প্রিয় পাঠক, সাহাবা তাবেয়িন যেভাবে বুঝেছেন আমাদেরকেও সেভাবেই বুঝতে হবে। অন্যভাবে বুঝতে গেলে সেটি গ্রহণযোগ্য হবে না। সুতরাং এ হাদিস থেকে এটি উদ্ধার করা যে, নারী-পুরুষের নামাজের পার্থক্য নেই, ঠিক নয়।

দৈনিক নেত্রকোনা
দৈনিক নেত্রকোনা