ব্রেকিং:
বিয়ে বাড়িতে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ! বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি তথ্যমন্ত্রীর চামড়া সংরক্ষণ যথাযথভাবে করা হয়েছে: শিল্প সচিব ‘এখনো ষড়যন্ত্র চলছে, বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ’ ‘চিকিৎসকদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হবে’

বৃহস্পতিবার   ১২ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৮ ১৪২৬   ১৪ রবিউস সানি ১৪৪১

১২৫০

নদী, তুমি কোন কথা কও!

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের অর্থনীতি, জীবন-জীবিকা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। অনাব্য নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে, ভূমিদস্যুদের হাত থেকে নদীকে বাঁচাতে, দূষণের তীব্রতা থেকে দেশের সব নদীকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের সবার। নদী নিয়ে সুহৃদ সমাবেশের আজকের আয়োজন...

সব্যসাচী লেখক ও কবি সৈয়দ শামসুল হক তার আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে এ দেশের নদীর কথা বলেছেন কবিতায়- 

'আমি জন্মেছি বাংলায়, আমি বাংলায় কথা বলি,

আমি বাংলার আলপথ দিয়ে হাজার বছর চলি।

চলি পলি মাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।

তেরো শত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে?'

তেরো শত নদীর এই বাংলাদেশ। নদীমাতৃক দেশ। মঙ্গলকাব্যে চাঁদ সওদাগরের বাণিজ্যের কথা আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ঐতিহ্য হাজারো নদী এ দেশের ইতিহাসকে করেছে সমৃদ্ধ। নদীগুলো এ দেশকে করেছে সৌন্দর্যময়, সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা। শ্যামল মাটির অঙ্গে এ নদীগুলো এ দেশের প্রাণ। 

নদীর কথা বলতে গেলে নদী নিয়ে গানের কথা উঠে আসে। হাজারো গানের উপজীব্য নদী। 'এই পদ্মা, এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তটে/আমার রাখাল মন গান গেয়ে যায়/এ আমার দেশ/এ আমার প্রেম/আনন্দ বেদনা মিলন বিরহ সংকটে...'। নদীকে কেন্দ্র করে এমন সমৃদ্ধ গানের সংখ্যা অনেক। কবিতার সংখ্যাও অগণিত। চিত্রশিল্পে নদী, নদীর বুকে পাল তোলা নাও, নদীর ঢেউ, নদী ও নারীর ছবি এঁকেছেন চিত্রশিল্পীরা। এ দেশের নদীর পাড়ের দৃশ্য পর্যটকদের মন কাড়ে। এ কারণে নদীমাতৃক এ দেশে জন্ম নিয়েছেন কবি, গায়ক, চিত্রশিল্পী। নদীর কাছে প্রেরণা আছে, অফুরন্ত রূপ আছে, রূপের মহিমান্বিত আছে। তাই তো নদীতে নৌকার মাঝি আপন মনে গেয়ে ওঠেন ভাটিয়ালি, মারফতি আর মুর্শিদি গান। পদ্মা নদী নিয়ে বিখ্যাত গান রচনা করলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম- 'পদ্মার ঢেউ রে/মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা যা রে...'। বিখ্যাত গানের শিল্পী আবদুল আলীম গাইলেন- 'সর্বনাশা পদ্মা নদী/তোর কাছে শুধাই/ বল আমারে তোর কিরে আর/কূলকিনারা নাই।'

পদ্মা নদী নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের আর আবদুল আলীমের গান পর্যালোচনা করলে পদ্মা নদীর সেই রূপ আর বর্তমানের রূপ এক নয়। মাঝে মাঝে পদ্মার বিনুনি বৈশিষ্ট্য।

ব্যথিত নারীর মতো শুস্ক মৌসুমে কাঁদতে থাকে জলবিহীন চোখে পদ্মা। তার বুকে জমা পড়েছে বালু আর পলি। কোথাও কোথাও হারিয়েছে নাব্য। নৌযান চলাচল বিঘ্নিতপ্রায়। আবার কোথাও কোথাও ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতি, স্থাপনা, কলকারখানা।

উল্লেখ করা যেতে পারে, নদী বয়ে চলে অবিরাম। এর গতি থামানো যায় না। 

পদ্মার মতো অসংখ্য নদী মানুষের অবিবেচনাসুলভ কর্মকাণ্ডের কারণে একে একে মরতে বসেছে। যদিও নদী মাল পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, অর্থনীতিকে রাখে সচল। নদী কেবল আমাদের দেহের খাদ্যই দেয় না; মনের খাদ্যের জোগানও দিয়ে থাকে। নদীর স্নেহ-মমতা, ভালোবাসা, শাসন-শোষণ জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মানুষের শৈশব-কৈশোরে, জীবন-যৌবনে। নদীর চোখের সামনেই বেড়ে উঠেছে অসংখ্য মানুষ। এমনকি জীবন-জীবিকার সম্পর্ক বিদ্যমান নদীর সঙ্গে। নদী থেকে প্রাপ্ত সম্পদ মাছ আমাদের প্রধান খাদ্য। কিন্তু নদীখেকো মানুষরা নদীকে গ্রাস করে ফেলেছে। বুড়িগঙ্গাকে করেছে দূষিত। তার দুই তীর ভূমিদস্যুরা দখলে নেওয়ায় নদীর দেহ হয়েছে সংকুচিত। রূপসী বাংলার অমর কবি জীবনানন্দ দাশের অমর কবিতা 'আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে।' সেই ধানসিঁড়ি নদীটি কেবল কবিতায় নামে আছে। চর পরে ভরাট হয়েছে তার দেহ। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কপোতাক্ষ নদও অধিকাংশ স্থানে তার নাব্য হারিয়েছে। যদিও গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতায় এনে পানি উন্নয়ন বোর্ড গঙ্গা থেকে পানি পাম্প করে জল সেচের ব্যবস্থা করেছে (সূত্র : নদী নিয়ে কথা/শরিফুল আলম)। 

আলোচ্য উপাখ্যানে তেরোশ' নদীর কথা তো আর উল্লেখ করা যাবে না। তিস্তা, করতোয়া, আত্রাই, কর্ণফুলী, বাঙ্গালী, নাফ, হালদা, সাঙ্গু, শীতলক্ষ্যাসহ বহু নদীই এখন রূপহীন, শ্রীহীন, অনাব্য এবং নৌযান চলাচলের অযোগ্য। এসব বড় নদীর শাখা নদী, উপনদীও রয়েছে। তাদের পলল মাটিকে দিয়েছে উর্বরতা। উর্বর মাটি মমতা ভরে মানুষকে দেয় শস্যসামগ্রী। শাখা নদী, উপনদী থেকে দীঘল মাঠের বুক বেয়ে বেয়ে জন্ম হয়েছে অসংখ্য খাল-বিল-নালা। শস্য উৎপাদন তথা মাছ আহরণ, এমনকি পাখি-প্রাণিকুলের খাবারের আভাসস্থল নদী-নালা-খাল-বিল। এখন আর সেসব খাল-বিল অধিকাংশই নেই। মানুষ বেদখল করে ভরাট করেছে, বসবাসের উপযোগী করে দখলে নিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশের ভারসাম্য অনেকটা ঝুঁকির সম্মুখীন। জীবিকা হারিয়েছে অসংখ্য মানুষ। এহেন পরিস্থিতিতে নদীগুলোকে আমাদের বাঁচানো দরকার। তাই দেশের সব নদীকে বাঁচাতে আমাদের স্লোগান হওয়া উচিত 'নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে'।

দৈনিক নেত্রকোনা
দৈনিক নেত্রকোনা